টাঙ্গাইল পতিতাপল্লী থেকে যৌনকর্মীদের চলে যাওয়ার বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন - অনলাইন দৈনিক সমবাদ,সত্য সংবাদ প্রকাশে ২৪ঘন্টা,True News publish the 24 hours "Online Daily Samobad"

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Thursday, July 24, 2014

টাঙ্গাইল পতিতাপল্লী থেকে যৌনকর্মীদের চলে যাওয়ার বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

www.samobad.com ::রাশেদ খান মেনন (রাসেল)॥ টাঙ্গাইল  জেলার পৌর এলাকায় শহরের মডেল থানার নিকটবর্তী বহুবছরের পুরনো একটি পতিতাপললী থেকে প্রায় এক হাজার যৌনকর্মী কোন এক অদৃশ্য কারনে নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করে চলে গেছে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে। পতিতাদের কাছ থেকে জানা যায়, এদের মধ্যে প্রায় ৪৫০ জন রাজবাড়ী দৌলতদিয়া পতিতালয়, কেউ সিরাজগঞ্জ, কেউ ময়মনসিংহ, কেউ কেউ নিজ এলাকায় ও বেশীরভাগ ছড়িয়ে পড়েছে শহরের বিভিন্ন জায়গায়। আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছে শহরের পাশ্ববর্তী উপজেলাগুলোতেও। এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন সাধারন মানুষজন।
টাঙ্গাইলে অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির আন্দোলনের চাপে পতিতাপল্লীর প্রায় একহাজার  যৌনকর্মী ১২ জুলাই শনিবার রাতেই তাদের নিদ্রিষ্ট এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। তাদের চলে যাওয়ার সম্পর্কিত বিষয়টি জানতে  সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় মাঝ বয়সি পতিতা বিউটির সাথে সে  জানায়, প্রভাবশালীদের চাপের মুখে তারা তাদের দীর্ঘদিনের জায়গা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ঘটনার পরদিন থেকেই পতিতা পল্লীর ঘর বাড়ি ভেঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে প্রায়  বাড়ির মালিক ও পতিতাদের সর্দারনীরা।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, প্রায় শত বছর পূর্বে টাঙ্গাইল জেলার লৌহজং নদীর তীরবর্তী শহরের কান্দাপাড়ায় এ পতিতা পল্লী গড়ে ওঠে।
টাঙ্গাইলে গত ৫ জুলাই শুক্রবার “অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ” নামে একটি কমিটি গঠিত হয়। ৬ জুলাই শনিবার টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে থেকে তারা বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে পতিতালয় উচ্ছেদের দাবীতে টাঙ্গাইলের পৌর মেয়রের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে। এছাড়াও পতিতালয় উচ্ছেদের আহবান ও বিভিন্ন কারন জানিয়ে শহরে লিফলেট বিতরন করা করে। পরবর্তীতে ১১ জুলাই শুক্রবার টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও বেবীস্ট্যান্ড মসজিদ প্রাঙ্গনে জেলার বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসা কমিটির নেতা কর্মীরা আরো একটি সভা করেন। এসকল সভা সমাবেশে যৌন কর্মীদের পতিতাবৃত্তি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহবান জানানো হয়। সেইসাথে সেচ্ছায় পতিতালয় ছেড়ে চলে না গেলে তাদের উচ্ছেদ করার জন্য সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়। এরপর ১২ জুলাই হটাৎ করেই নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করে পতিতারা চলে যায়। ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জায়গায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা বলেন, শহরের কান্দাপাড়ায় প্রায় শত বছরের পুরনো ওই পতিতাপল্লীতে এক হাজারেরও বেশি যৌনকর্মী ছিল। হঠাৎ করেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা চলে যেতে বাধ্য হয়। জোৎনা নামের এক পতিতা জানায় জায়গা খালি করতে বলায় ওই দিনই মেয়েরা জায়গা ছেড়ে চলে গেছে। কে জায়গা খালি করতে বলছে জানতে চাইলে বলে অনেকেই জানে তবে কেউ মুখ খোলে নাই। আর আমি কইয়া বিপদে পড়মু নাকি? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা কেউ কেউ বলেন যাদের বের করে দেয়া হয়েছে তাদেরকে যদি পুনর্বাসন করা হতো তাহলে ভালো হতো ।
যৌনকর্মীরা চলে যাওয়ার পরপরই পতিতালয় পল্লীর বাড়ির মালিকরা তাদের ঘর ভেঙ্গে নিয়ে যেতে শুরু করে। কারা তাদেরকে পল্লী ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে এবিষয়ে যৌনকর্মীরা কিছু বলতে রাজী হয়নি। এমনকি যৌনকর্মীদের সংগঠন নারীমুক্তির সভানেত্রী আকলিমা বেগম আঁখিও এ বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজী হননি।
স্থানীয়রা বলেন, গত কিছুদিন ধরেই টাঙ্গাইল অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির ব্যানারে ওই পল্লী উচ্ছেদের জন্য আন্দোলন চলছিলো।
টাঙ্গাইলের পৌর মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি এ বিষয়ে বলেন, পল্লীটি উচ্ছেদ করা হয়নি বরং সামাজিক চাপের কারণে ওই পল্লীর বাড়ির মালিকরাই যৌনকর্মীদের বাড়িগুলো ছেড়ে দিতে বলেছেন। "কেউ যদি স্বেচ্ছায় চলে যেতে চায়, ভালো হতে চায় বা বাড়ির মালিক যদি ভাড়াটিয়া সরিয়ে দিতে চায় আর কেউ যদি আমাদের না বলে তাহলে তো কারও কিছু করার নেই।
পুলিশ প্রশাসনের কাছে পল্লীটি উচ্ছেদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা জানায়, এবিষয়ে কেউ কোন অভিযোগ করেনি।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায় টাঙ্গাইলে এর আগে ২০০৬ সালেও ওই পতিতাপল্লীটি উচ্ছেদের জন্য আন্দোলন শুরু হয়েছিলো। তখন কিছু মানুষ হঠাৎ করেই “পতিতালয় উচ্ছেদ কমিটি” গঠন করে পতিতালয় উচ্ছেদের আন্দোলন শুরু করেছিল। টাঙ্গাইলের তৎকালিন জেলা প্রশাসক বশীর আহমেদ এ আন্দোলনে প্রত্যক্ষ মদদ দেন। তৎকালিন পৌরসভার মেয়র জামিলুর রহমান মিরন এক পর্যায়ে এই উচ্ছেদ আন্দোলনে সহযোগীতা করেন। তারা সে বছর অক্টোবরের ৮ তারিখ ‘পতিতালয়’ উচ্ছেদের লক্ষে নিষিদ্ধ পল্লী ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষনা করেন। তখন এ বিষয় নিয়ে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। দেশ বিদেশের মানবাধিকার সংগঠন ও মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছিল দিনটির দিকে। প্রশাসন এতে নিষিদ্ধ পল্লীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। টাঙ্গাইল শহীদ মিনারে ওই দিন নাগরিক সমাজ এই উচ্ছেদ আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। উচ্ছেদ আন্দোলনকারীরা পুলিশী বাঁধার মুখে নিষিদ্ধ পল্লীর দিকে যেতে না পেরে শহীদ মিনারে গিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ সভায় হামলা ও ভাংচুর করে। সেদিন বেশ কয়েকজন নারীসহ নাগরিক সমাজের অনেকেই আহত হয়। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ হওয়ায় উচ্ছেদ আন্দোলনকারীরা থেমে যায়।

তবে এবার অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির দাবির মাধ্যমে প্রচারিত ‘টাঙ্গাইল শহরের পতিতালয় সর্ম্পকে কিছু কথা’ শীর্ষক লিফলেট  বিশেষভাবে উল্লেখ ছিল জেলাব্যাপী মাদক, ইয়াবা, হেরোইনসহ সকল নেশা দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের  প্রধান আখড়া এই পতিতালয়।
সম্ভবত দেশের কোন যৌনপল্লী এমন নিরবে নিভৃতে উচ্ছেদ হয়নি। টাঙ্গাইল অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির নেতৃবৃন্দ খুবই দক্ষতা ও সুচারুতার পরিচয় দিয়েছেন। কারন এ বিষয়ে কারো কোন অভিযোগ নেই।
প্রায় একমাস আগে কথা হয়েছিল লায়লা নামের ৬০ বছর বয়সী এক সরদারনীর সাথে। তার কাছ থেকে জানতে পারি, যারা যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের এ পেশা ছাড়তে হয়। পরে অন্যদের ফুট ফরমায়েশ খেটে, আয়া-বুয়ার কাজ করে কিংবা পূর্বের জমানো টাকায় কোনমতে বেঁচে থাকতে হয় যৌনপল্লীতে। কেউবা ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়। এমনও অনেক বৃদ্ধা প্রাক্তন যৌনকর্মী রয়েছে, যাদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই। তবুও অন্যান্যদের মত তারাও চলে গেছে কোথায়, তা আজ যেন কারো জানা নেই।
যৌনপল্লীত এমন অনেক যৌনকর্মী আছেন যাদের অনেক টাকা পয়সা আছে। তারা হয়তো অন্য কোন যৌনপল্লীতে অথবা সঞ্চিত অর্থ দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু এমন অনেক মেয়ে ছিল যারা কিশোরী বয়সে প্রতারিত হয়ে এখানে এসেছিল। যাদের অনেকের বাবা-মা ভাই-বোন কেউ নেই। ফিরে যাওয়ার মতো কোন জায়গাও নেই। তারা কি করবে? হয়তো জীবন জীবিকার তাগিদে মিশে যাবে মানুষের মাঝে। যা এই সমাজের জন্য ভাল কোন ফল বয়ে আনবে কিনা এটাই প্রশ্ন অনেকের। অপরদিকে  কেউ কেউ বলেন পতিতা পল্লী খালি হওয়ায় স্বস্তি ফিরে পেযেছে সাধারন মানুষ। একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে সমাজের কিছু সচেতন মানুষের সাথে আমিও মনে করি, তারাহুরা না করে একটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে পতিতাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে পতিতালয়টির বিলুপ্তি ঘটালে সকলের মানবাধিকার রক্ষা হতো।
প্রতিবেদক -
মোঃ রাশেদ খান মেনন (রাসেল),


No comments:

Post Bottom Ad

Pages