ধানসিড়ি নদী ও কবি জীবনান্দ দাশের স্মৃতি আজ আর নেই - অনলাইন দৈনিক সমবাদ,সত্য সংবাদ প্রকাশে ২৪ঘন্টা,True News publish the 24 hours "Online Daily Samobad"

শিরোনাম

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Sunday, June 16, 2013

ধানসিড়ি নদী ও কবি জীবনান্দ দাশের স্মৃতি আজ আর নেই

রেজাউল কবির পল্টু,ও আঃ আউয়াল গাজী,রাজাপুর থেকেঃ কবি জীবনানন্দ দাশের পুর্ব পুরুষের বাস স্থান ছিল সাবেক ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের গাওপাড়া গ্রামে।১৭৭৪ খ্রি থেকে ১৮২৯ খ্রি পর্যন্ত পদ্মার ভাঙ্গনে গাওপাড়া গ্রামটি রাজা রাজ বল্লভের রাজনগর গ্রামের সাথে  পদ্মা সম্পুর্ন বিলিন হয়ে যায়।এই থেকে পদ্মার অপর নাম হয় কৃর্তিনাশা পদ্মা।গাওপাড়া গ্রামটি পদ্মায় বিলিন হওয়ার পরে জীবনানন্দ দাশের প্রপিতামহ মহেন্দ্রকুমার দাশ গুপ্ত তার তিন পুত্র সর্বানন্দ দাশ গুপ্ত,নিত্যানন্দ দাশ গুপ্ত,ও প্রমানন্দ দাশ গুপ্ত কে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিনাঞ্চলের সেলিমাবাদ পরগনার সাবেক বরিশাল জেলার ঝালকাঠী থানার (থানা প্রতিশঠিত ১৮২৪)কৃতিপাশা জমিদার বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহন করেন।কৃতিপাশা জমিদারীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কৃঞ্চ রাম সেন।(১৬৮৮-১৭৫৯ খ্রি)তিনি এক সময় রায়ের কাঠী রাজপরিবারে দেওয়ান পদে চাকুরী করতেন এবং পরবর্তিতে তার অধস্তন দত্তক বংশ ধরেরা জমিদারী খরিদ করে অনেক ভূসম্পত্তির মালিক হন।মহেন্দ্র কুমার দাশ গুপ্ত তার বসত ভিটা ও খুদ্র তালুক হারিয়ে আর্থিক সঙ্কটে পড়ায় তিনি কৃতিপাশা জমিদার বাড়ীতে সেরেস্তা পদে চাকুরী নিয়ে পরিবার পরিজন সহ বসবাস করিতে থাকেন।এক পর্যায় কৃ্তিপাশার জমিদার পরিবার তাদের জমিদারীর অধিনে সাবেক ঝালকাঠী থানার (বর্তমান রাজাপুর থানাধীন)বামনকাঠী গ্রামের কিছু অংশ জমি দাশ পরিবারের ভরন পোষন ও স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বন্দোবস্ত দেন।বামনকাঠীতে দাশ গুপ্ত পরিবার আগমনের পূর্বে এখানে সেন বংশ পরিবারটি কৃ্তিপাশা জমিদারীর অধিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করতো।মহেন্দ্র কুমার দাশ গুপ্তের মৃতুর পরে তার প্রথম পুত্র সর্বানন্দ দাশ গুপ্ত কৃ্তিপাশা জমিদারীর অধিনে প্রথমে চাকুরী নেন।এবং পরবর্তীতে কৃতিপাশা জমিদারের সহায়তায় বাকরগঞ্জ জেলা কালেক্টরীতে চাকুরী নিয়ে কৃতিপাশার জমিদারদের বরিশাল শহরের বাসভবন “নাবালক লজে” অস্থায়ীভাবে বসবাস করতেন।ততকালীন বাকরগঞ্জ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সংগে  কৃতিপাশা জমিদারদের সু সম্পর্ক ছিল।বরিশাল ‘নাবালক লজ’ ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একটি সেতু বন্ধনে আবদ্ব হয়ে ছিল।সর্বানন্দ দাশ গুপ্ত ‘নাবালক লজ’ ছেড়ে বরিশাল শহরে জমি ক্রয় করে একটি আবাসন গড়ে তোলেন।তার ছোট দুই ভ্রাতা  নিত্যনান্দ দাশ গুপ্ত ও প্রেমানন্দ দাশ গুপ্ত বামন কাঠী গ্রামের সেনবাড়ী সংলগ্ন স্থায়ী বসত বাড়ী গড়ে তোলেন। যা পরবর্তীতে দাশ বাড়ী নামে পরিচিত লাভ করে।সর্বানন্দ দাশ গুপ্ত ঝালকাঠীর বাটারকান্দা গ্রামের দাশ বাড়ীতে বিয়ে করেন এবং তিনি চাকুরীর সুবাধে বরিশালে বসবাস করলেও তার পরিবার পরিজন বামনকাঠী গ্রামের দাশ বাড়ীতে বসবাস করত।তার পাচ পুত্র ও চার কন্যাঃপুত্র(১)ব্রম্মানন্দ,(২)যোগানন্দ,(৩)সত্যানন্দ,(৪)অতুলানন্দ,(৫)জ্ঞানানন্দ,ও কন্যাঃ(১)প্রিয়ংবদা,(২)প্রমদা,(৩)স্নেহলতা,(৪)অজ্ঞাত। সর্বানন্দ দাশগুপ্ত শিক্ষিত ছিলেন।সে সময় গ্রামের লোকজন তাকে ভক্তিশ্রদ্বা করতো।সর্বানন্দের মৃতুরপরে তার দুই পুত্র ব্রম্মানন্দ ও যোগানন্দ কলকাতায় চলে যান এবং চতুর্থ ও পঞ্চম পুত্র বরিশালে থেকে যান।সর্বানন্দের তৃতীয় পুত্র সত্যানন্দ দাশ গুপ্ত  কৃ্তিপাশা ,বরিশাল ও কলকাতায় লেখা পড়া করেন।সত্যানন্দ কলকাতা হিন্দু কলেজ থেকে এফ এ পাশ করে বরিশাল ট্রেজারীতে চাকুরী নেন এবং সাবেক ঝালকাঠী থানার (বর্তমান রাজাপুর থানা)২নং শুক্তাগড় ইউনিয়নের পিংরী গ্রামের কালী মোহন দাশের কন্যা কুশুমকুমারী দাশকে বিয়ে করেন।কালী মোহন দাশের বড় ভ্রাতা জগমোহন দাশ পরবর্তীকালে  বামনকাঠী গ্রামে জমি ক্রয় করে বসতবাড়ী গরে তোলেন।কালী মোহন দাশ বিয়ে করেন ঝালকাঠীর সাচিলাপুর গ্রামে।তার স্ত্রীর নাম প্রসন্ন কুমারী দাশ।সত্যানন্দ দাশ গুপ্ত বরিশাল ট্রেজারীতে চাকুরীকালিন সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে কলকাতা প্রসিডেন্সী কলেজ থেকে অনিয়মিত ছাত্র হিসাবে (বহিরাগত)বি এ পাশ করেন।তিনি ই সর্বপ্রথম শুক্তাগড় ইউনিয়ন বামনকাঠী গ্রামের অধ্যাপক বনমালী গাঙ্গুলী(পন্ডিত বেদান্ততীর্থ)।সত্যানন্দ দাশ গুপ্ত মুক্ত ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারনে ট্রেজারী অফিসে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে মহাত্না অশ্বিনী কুমার দত্তের আহ্ববানে বরিশাল বি এম স্কুলে সহকারী শিক্ষকতায় চাকুরী নেন।তিনি অশ্বিনী কুমার দত্তের সঙ্গে ‘ব্রাম্ম সমাজে’যোগ দেন এবং ব্রাম্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক ছিলেন।তিনি বি এম স্কুলের প্রধান শিক্ষক দ্বায়িত্ব ও পালন করেন।অবিভক্ত বাংলার সর্বপ্রথম খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী শুক্তাগড় গ্রাম নিবাসী সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী(ঠাকুর চাদ)অধ্যাপক বনমালী গাঙ্গুলী (ভ্রাতুস্পুত্র)সত্যানন্দ দাশের স্ত্রী কুসুম কুমারী দাশ কবি ছিলেন।‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’।এই প্রবাতপ্রতীম কবিতাটির লেখক কুসুম কুমারী দাস।তিনি কয়েকটি কাব্য গ্রন্থের রচায়িতা।সর্বানন্দ দাশগুপ্ত ও তার পুত্র সত্যানন্দ দাশগুপ্ত ব্রম্ম ধর্মালম্বী ছিলেন।ব্রম্ম ধর্মের মুল কথা ‘একেশ্বরে বিস্বাস।এই জন্য ব্রম্ম ধর্ম লম্বীদেরকে একেশ্বরবাদী ও বলা হয়ে থাকে।বামনকাঠী দাশগুপ্ত বংশ একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিল এবং তারা ব্রম্ম ধর্মে’দীক্ষিত হয়।বামনকাঠী দাশ পরিবারের প্রভাবেই বামনকাঠী গ্রামকে ‘একেশ্বরা নামে নামে নাম করন করা হয়।বর্তমানে বামনকাঠির অপরনাম ‘একেশ্বরা’।কিন্তু সরকারী কাগজপত্রে কোথাও ‘একেশ্বরা’ নামে গ্রাম বা মৌজার অস্তিত্ব নেই।সত্যানন্দ দাশগুপ্তের প্রথম পুত্র কবি জীবানন্দ দাশগুপ্ত ১৮৯৯ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী ও দ্বিতীয় পুত্র সমারন্দ দাশ গুপ্ত ১৯০১ সালের১২ই অক্টোবর বর্তমান ঝালকাঠীর রাজাপুর উপজেলাধীন শুক্তাগড় ইউনিয়নের বামনকাঠী গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন।সত্যানন্দ দাশগুপ্ত বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলনের(১৯০৫)প্রথম দিকে তার দুই পুত্র ও স্ত্রী কুসুম কুমারী দাশকে নিয়ে বরিশাল শহরে সর্বানন্দ ভবনে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন এবং তার দুই ভ্রাতা পিতার মাতুলালয়ে (বাটারকান্দা) বসবাস করতে থাকেন।সত্যানন্দ দাশের পিতার দুই ভ্রাতা নিত্যানন্দ ও প্রেমানন্দের পৌ্ত্ররা বামনকাঠি গ্রামে স্থায়ী বাস করতো।নিত্যানন্দ দাশের পুত্র (১) তারুন কুমার দাশ (২) আখিলকুমার দাশ ও প্রেমানন্দ দাশের পুত্র মাহিমা চন্দ্র দাশ।মাহিমা চন্দ্র দাশের তিন পুত্র (১)অগ্নিকুমার দাশ,(২)রেবতী কুমার দাশ,(৩)অক্ষয় কুমার দাশ।তাদের নাম সহ পুত্রদের নামে বামনকাঠী গ্রামে ভুমি জরিপের সিএস,আর এস ও এস এ খতিয়ানে রেকর্ড হয়েছে।নিত্যানন্দ দাশের এক পুত্র ফরিপুর গোপালগঞ্জে বাস করেছেন।
জীবনানন্দের মাতা কুসুম কুমারী দাশের ছোট বোন হেমন্তকুমারীকে বিয়ে দেন বামনকাঠী গ্রামের দাশ বাড়ী সংলগ্ন সম্ভান্ত বংশ সেন বাড়ীতে।সেন বংশ ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রভাব ও প্রতিপত্তি নিয়ে বামনকাঠী গ্রামে বসবাস করতো।সেন বংশের অধিকাংশ লোক বরিশাল ও কলকাতায় বাস করিতো এবং এ বংশের অনেকেই শিক্ষিত ছিলেন।হেমন্ত কুমারী সেন কলকাতায় লেখা পড়া করেন।ব্রিটিশ আমলে সেন ও দাশ বংশের বামনকাঠী গ্রামের স্থায়ীভাবে বসবাসের কারনে তাদের বাড়ী কেন্দ্র করে এখানে বৈশাখী মেলার আয়োজনসহ একাধিক মেলা বসত।মেলায় নাচ,গানসহ সর্বসাধারনের মিলন মেলায় পরিনত হত।দেশ বিভাগের পরেও এ গ্রামে মেলা বসত।সেন ও দাশ বংশের দুর-দুরন্তের আত্নীয় স্বজন এ মেলায় বেড়াতে আসতো।সেন বাড়ীতে পুকুর ঘাটলা,পাকা মঠ ও মন্দির,বাড়ীর প্রাচির সহ কয়েকটি আধাপাকা দালান কোঠা ছিল।সেন ও দাশ বাড়ীর ভগ্ন দেয়াল,মঠ ও মন্দির আশির দশকেও প্রতক্ষ করা গেছে।আশির দশকের শেষ দিকে দাশ ও সেন বংশের সর্বশেষ বসবাসরত পরিবার গুলো তাদের বসতবাড়ী সহ ভিটেমাটি স্থানীয় লোকজনের কাছে বিক্রি করে পশ্চিমবাংলায় চলে যায়।কবি জীবানন্দ দাশের শৈশব,কৈশোর ও যৌবনকালের কিছু সময় পৈত্রিক ভিটা ও জন্মস্থান বামনকাঠীর দাশ বাড়ী ও তসংলগ্ন মাসিমা হেমন্তকুমারী সেনের বাড়ীতে অতিবাহিত হয়েছে।তিনি পূজো ও মেলার সময় বহুবার এখানে বেড়াতে এসেছেন।তার খাওয়া রাত্রি যাপন মাসিমার বাড়ীতেই বেশী হতো।মাসিমা হেমন্তকুমারী সেন তাকেঁ পূত্র স্নেহে কাছে রাখতেন।জীবনানন্দের  মাসিমা হেমন্ত কুমারী সেনের বাড়ীর এক মেয়েকে কবি হয়ত অন্তর দিয়ে ভালবাসতেন।মেয়েটির অনিচ্ছা সত্বেও বরিশালে কর্মরত নাটোরের এক ভদ্রলোকের সাথে মেয়েটিকে বিয়ে দেওয়া হলে কবি তাকে মন থেকে ভুলতে পারিনি।বনলতা সেন কবির দেওয়া কাল্পনিক নাম।সেন বাড়ির মেয়েকে কেন্দ্র করেই কবি ‘বনলতা সেন’কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন।কালক্রমে বনলতা সেনের পরে যে কাব্য পাঠকের কাছে সবচেয়ে বেশী সমাদৃত হয়ে উঠেছিল তা সম্ভবত ‘রুপসী বাংলা’।যতদুর জানা যায়,আধুনিক পাঠকের কাছে রুপসী বাংলার যশ বনলতা সেনের সিদ্দিকেও অচিরে অতিক্রম করে গিয়াছিল।কবি জীবানন্দ দাশের আজীবন স্মৃতি বিজরিত ও অতিপ্রিয় ‘ধানসিড়ি নদী’।এই ধানসিড়িকে কেন্দ্র করেই ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটি ‘রুপসি বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ্যে লিখেছেন এবং রুপসী বাংলার অনেক জায়গায়ই ‘ধানসিড়ি’ কথাটি উল্লেখ করেছেন।এই ধানসিড়ি বাংলার মানুষের কাছে আজ জন প্রিয় নাম।বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠী একটি ঐতিয্যবাহী জেলা।ঝালকাঠির সুতালড়ী বারইকরনকে কেন্দ্র করে পলাশীর ট্রাজিডির ( ১৭৫৭) সুত্রপাত।ঝালকাঠী জেলার প্রায় চারপাশ ধরে রয়েছে নদী।এরই একপাশে বহমান এই ধানসিড়ি।ঝালকাঠীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রাজাপুর থানা পর্যন্ত বির্স্তৃত এই ‘ধানসিড়ি’ নদী।ঝালকাঠী ও রাজাপুরের বিভিন্ন স্তরের লোকজনের মতামত আর ইতিহাস থেকে ‘ধানসিড়ি’র নাম করন সম্পর্কে অনেকটি মতবাদ পাওয়া যায়।এর মধ্যে প্রথমটি হলো এককালে এই নদীর তীরে ফলতো প্রচুর বালাম ধান।সেদ্ব বালাম চাল চালান হতো দূর দুরন্তে।তার থেকেই নদীর নাম হয়ে যায় ‘ধানশ্রী’।ক্রমে লোকমুখে সেই নাম পালটে হয় ‘ধানসেদ্ব’।সেই ধানসেদ্বই পরবর্তিতে হয়ে পড়ে ‘ধানসিড়ি’।উল্লেখ্য বরিশাল ইতিহাস সম্পর্কিত এইচ বিভারিজ ‘দি ডিস্ট্রিক অব বাকেরগঞ্জ ১৮৭৬,ঘোষাল চন্দ্র রায়ের ‘বাকেরগঞ্জ ইতিহাস’ ১৮৯৫ ও কৃতিপাশার রোহিনী কুমার সেনের ‘বাকলা’(১৯১৫) গ্রন্থে ‘ধানসিদ্ব’ নামে এই নদীটির নাম উল্লেখ আছে। দ্বিতীয় মতবাদটি কবি জীবনান্দকে জরিয়ে।এই মতবাদটি এখন বহুল প্রচালিত।জীবনান্দ দাশের প্রতিমা সহ মহেন্দ্রকুমার দাশ এই নদীর নিকটবর্তী বামনকাঠীতে এসে বসতি স্থাপন করেছিল।তখন এর নাম ‘ধান্যশ্রী’।জীবনান্দ দাশ তার শৈশব,কৈশর ও যৌবনকাল বরিশাল থেকে জন্মস্থান বামনকাঠী ও মাতুলালয় পিংরী গ্রামে বেড়াতে গেলে তাকে এই নদী এবং পরিবেশ মুগ্ব করে।তিনি ব্রিশাল থেকে স্টীমারযোগে কলকাতা যাতায়ত করতেন এই নদী পথেই।পরে কোন একসময় তিনি ‘ধানশ্রী’কে ‘ধানসিড়ি’নাম দিয়ে কবিতা লিখেন ‘আবার আসিব ফিরে’।১৯৫৭ সালে ‘রুপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পরে স্থানীয় লোকজন কবি জীবনান্দ দাশের প্রতি সন্মান দেখিয়ে,কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে এর নাম রাখেন ধানসিড়ি।উপরোক্ত দুটি মতবাদ ছাড়াও ধানসিড়ি’র নাম করন নিয়ে আরো কিছু মতবাদ আছে।কিন্তু সে গুলোর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে,ভবিষ্যত বাংগালী প্রজন্মে এই ধানসিড়ি আর খুজে পাবো না।নদীর দুই তিরে চর পরে ভরাট হওয়ায় ভুমি দস্যুরা জোরপুর্বক ক্রমাম্বয়ে দখল করে নিয়ে যাচ্ছে এবং ১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই নদীর চার কিলোমিটার সম্পুর্ন ভরাট হয়ে ধানক্ষেতে পরিনত হয়েছে।আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ধানসিড়ি নদীটির অস্তিত্বও সম্পুর্ন মুছে যাবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্ম ধানসিড়ি নদীর কোন অস্তিত্ব খুজে পাবে না কোথাও তখন দেশের শাসকবর্গের প্রতি জন্মাবে মনের ক্ষোভ ও ঘৃনা। পদ্মা মেঘনা যমুনাসহ বাংলাদেশের বড় বড় নদীগুলো জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখলেও মাইকেল মধুসুদন দত্তের ‘কপোতাক্ষ’ ও জীবনান্দ দাশের ‘ধানসিড়ি’ মা মাটি মাতৃভুমির স্বাধিনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার চেয়ে অনেক গুন জাতির শক্তি ও সাহস যোগাতে প্রেরনা দিয়াছে।যতদিন মাতৃভুমির বাংলা ভাষাসহ স্বাধিন বাংলা সাহিত্য চর্চা টিকে থাকবে ততোদিন ‘কপোতাক্ষ’-ধানসিড়ি আপন স্রোতে বেচে থাকবে।কপোতাক্ষ- ধানসিড়ি কে বাদ দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্য চর্চা কোনদিনই পুর্নতা পাবে না।১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধিনতা যুদ্বকালিন সময় মুজিব নগর সরকারের অধীনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গীত ও কবিতা যেমনই বাংগালী ও দেশ প্রমিক মুক্তিযোদ্বাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ব করেছে,তেমনই মাইকেল মধুসুদন দত্তের সাগরদাঁড়ির ‘কপোতাক্ষ’ ও জীবনান্দ দাশের জন্মভুমি বামনকাঠীর ‘ধানসিড়ি’ কবিতাটি অনুরুপ দেশপ্রেমে জাগ্রত করেছে।কাজেই বাংগালী জাতির বাংলা সাহিত্য সৃস্টি ও মাতৃভুমির প্রতি গভীর মমত্ববোধের প্রেরনা যোগাতে জীবনান্দ দাশের অমর শৃস্টি ‘ধানসিড়ি’। ‘ধানসিড়ি আজ সমস্ত বাংগালীর আর একটি তীর্থভুমি এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অহংকার ও জাতীয়তাবাদের আরেকটি প্রেরনা। জাতীয় মহান নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এই নদী পথেই জন্মস্থান মাতুলালয় সাতুরিয়া ও কলকাতা যাতায়ত করেছেন।এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কাঠালিয়া থেকে রাজাপুর হয়ে লঞ্চযোগে এই নদীপথেই ঝালকাঠী জেলা সফর করেছিলেন।তিনি ধানসিড়ি নদীরতিরে ইন্দ্রপাশা গ্রামে লঞ্চ থামিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্বেশ্যে বক্তাব্য রাখেন এবং কবির স্বৃতির প্রতি শ্রদ্বা জানিয়ে কবিতাটির কয়েকটি চরন আবৃতি করেন।বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরে যুগেযুগে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে অনেক কবির স্মৃতি রক্ষার্থে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করেন।অথচ আধুনিক বাংলার সাহিত্ব অন্যতম কবি জীবনান্দ দাশের স্মৃতিবিজরিত জন্মভুমি বামনকাঠীর পৈত্রিক বাড়ী নিখোঁজ অবস্থায় জঙ্গলাকীর্নসহ শরিষা ও ধানক্ষেতে পরিনত হয়েছে।আর তার অতিপ্রিয় ধানসিড়ি নদীটি ভরে যাওয়ায় ভুমিদস্যুরা অতিদরিদ্র সার্টিফিকেট তৈরি করে সরকারের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দখল করে নিচ্ছে।আজ পর্যন্ত কোন সরকারই রুপসী বাংলার কবি জীবনান্দ দাশের স্মৃতি রক্ষার্থে কোন উদ্বোগ গ্রহ করেননি বা এগিয়ে আসেননি।দীর্ঘকাল যাবত অপসংস্কৃতির ধারা অব্যাহত থাকায় এখানেও আমরা সমগ্র জাতি ব্যার্থ হয়েছি।বর্তমান ধানসিড়িকে কেন্দ্র করে ধানসিড়ি নদীর দুই তীরে ( নদীটির পুর্নখননের জায়গা রেখে)গড়ে তোলা যায় বিভিন্ন স্থায়ী উন্নয়নমুলক প্রকল্প।একটি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়,বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে কোন সেনানিবাস না থাকায় ‘ধানসিড়ি’ নামে একটি সেনানিবাস,দক্ষিনাঞ্চলের বেকার জনগোস্টীর কর্মসংস্থানের উদ্বেশ্যে ধানসিড়িতে একটি সরকারী উদ্বোগে বস্ত্রশিল্প স্থাপন,ঝালকাঠীর গাবখানে নির্মিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুর নাম পরিবর্তন করে কবি জীবানন্দ দাশ ‘ধানসিড়ি’ সেতু নামকরন করা,কবি জীবনান্দ দাশের ১৭ ফেব্রুয়ারী জন্ম বার্ষিকী ও ২২ শে অক্টোবর মৃতু বার্ষিকীতে ধানসিড়ির তীরে আলোচনাসভা,সাংস্কৃতিক অনুশঠান-জীবনান্দ কুটির শিল্প মেলার আয়োজন,সরকারী উদ্বেগে এখানে একটি স্থায়ীভাবে ‘জীবনান্দ মঞ্চ’ নির্মান ও একটি সাহিত্য সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া যায়।ধানসিড়ি নদীটির অস্তিত্ব রক্ষার্থে অচিরেই নদীটি পুনঃখননের প্রায়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হলে দেশবাসীর দীর্ঘদিনের প্রানের দাবি বাস্তবে রুপ লাভ করবে এবং অত্র অঞ্চলের দরিদ্র জনগোস্টী অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবে।






Post Bottom Ad

Pages